সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর
ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব — সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং নিপীড়নের মতো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। যদিও তারা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পরই ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, অভিযুক্তরা কোনো দয়া বা ক্ষমা চাননি।
চৌধুরীর ছেলে হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, “আমার বাবা বলেছেন তিনি কোনো করুণা চাননি। তিনি সবসময় বলেছেন তিনি নির্দোষ।” তিনি জানান, ফাঁসির কয়েক ঘণ্টা আগে বাবার সঙ্গে শেষবার দেখা করেন।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
সাকা চৌধুরী নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিবিদ ও মুসলিম লীগের নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। ফজলুল কাদের ১৯৬৫ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার ছিলেন।
সাকা চৌধুরী ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম সিনিয়র নেতা ছিলেন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টিতে দোষী সাব্যস্ত করে, যার মধ্যে ছিল গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন। প্রসিকিউশনের মতে, চট্টগ্রামে তার পারিবারিক বাড়ি একটি টর্চার সেলে পরিণত হয়েছিল।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
মুজাহিদ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপন্থী ছাত্র নেতা ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর আত্মগোপনে যান। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থিত হন।
২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে অপহরণ, হত্যা এবং যুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিতর্ক
বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের জন্য অপরিহার্য। তবে বিরোধী দলগুলো এই ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ এনেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবিতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই আন্দোলন দমন করতে নির্মম দমন-পীড়ন শুরু করলে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপে ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশ সরকার বলছে, এই যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়, যদিও স্বাধীন গবেষকদের মতে, এই সংখ্যা ৫ লাখের কাছাকাছি।
0 Comments